in ,

করোনায় জাপানে মৃত্যুর হার কমের কারণ

করোনায় জাপানে মৃত্যুর হার কমের কারণ
করোনায় জাপানে মৃত্যুর হার কমের কারণ

জাপানে কোভিড-১৯-এ মৃত্যুর সংখ্যা কেন এত কম? মৃত্যু নিয়ে এ ধরনের প্রশ্ন খারাপ শোনালেও এ নিয়ে এখন নানা তত্ত্ব আলোচনায় উঠে আসছে। কেউ বলছে এর পেছনে রয়েছে জাপানীদের মন-মানসিকতা, তাদের সংস্কৃতি, আবার কারো মত হল জাপানীদের ইমিউনিটি অসাধারণ।

কোভিড-১৯ এ মৃত্যুর হার ওই অঞ্চলে জাপানেই যে সর্বনিম্ন তা কিন্তু নয়। মৃত্যুর খুবই কম হার নিয়ে ওই এলাকায় বরং গর্ব করার মত দেশগুলো হল দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, হংকং এবং ভিয়েতনাম।

কিন্তু ২০২০ এর গোড়ার দিকে, জাপানে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল দেশটিতে ওই সময়ে সার্বিকভাবে গড় মৃতের হারের চেয়ে কম। এপ্রিল মাসে সম্ভবত কোভিডের কারণে টোকিও-তে গড় মৃত্যুর হার ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় এক হাজার বেশি। তারপরেও বছরের প্রথম দিকের হিসাবের ওপর ভিত্তি করে অনুমান করা হচ্ছে, জাপানে এ বছর মোট মৃত্যুর সংখ্যা ২০১৯ এর থেকে কম হবার সম্ভাবনাই বেশি।

এটা খুবই বিস্ময়কর, কারণ কোভিড-১৯এ মৃত্যুর হার বাড়ার অনেকগুলো সম্ভাবনা জাপানের ক্ষেত্রে রয়েছে। অথচ জাপান কিন্তু তার প্রতিবেশি দেশগুলোর মত সর্বশক্তি দিয়ে এই ভাইরাস মোকাবেলায় নামেনি।

ফেব্রুয়ারি মাসে উহানে করোনাভাইরাসের প্রকোপ যখন তুঙ্গে, যখন শহরটির হাসপাতাল রোগীর ভিড়ে উপচে পড়েছে, যখন চীন থেকে ভ্রমণের ব্যাপারে সারা বিশ্ব দেয়াল তুলে দিয়েছে, তখন জাপান তার সীমান্ত বন্ধ করেনি।

ভাইরাস যখন দ্রুত ছড়াচ্ছে, তখন অল্প দিনের মধ্যেই এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে কোভিডে মারা যাচ্ছে মূলত বয়স্করা, জনসমাগম থেকে এই ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি এবং আক্রান্তের কাছাকাছি বেশি সময় কাটালে আক্রান্ত হওয়ার ব্যাপক আশংকা।

জাপানের ক্ষেত্রে এর সবগুলো রয়েছে অর্থাৎ মাথা পিছু বয়স্ক মানুষের সংখ্যা পৃথিবীর যে কোন দেশের চেয়ে জাপানে বেশি। জাপানের বড় বড় শহরগুলোতে জনসংখ্যা ব্যাপক- শহরগুলো মানুষের ভিড়ে ঠাসা।

টোকিওতে বাস করে তিন কোটি ৭০ লক্ষ মানুষ এবং বেশিরভাগ মানুষের জন্য চলাচলের একমাত্র বাহন হল ভিড়ে ঠাসা শহরের ট্রেন পরিষেবা। জাপান এমনকী সেসময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ – ‘টেস্ট, টেস্ট, টেস্ট’ উপেক্ষা করেছে। এমনকী এখনও জাপানে পরীক্ষা করা হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ৪৮ হাজার মানুষকে- যা জাপানের জনসংখ্যার ০.২৭%।

ইউরোপের দেশগুলোতে যে মাত্রায় লকডাউন দেয়া হয়েছে, জাপানে সেভাবে কোন লকডাউন হয়নি।শুধু এপ্রিলের গোড়ায় জাপানের সরকার একবার জরুরি অবস্থা জারি করেছিল। ঘরের ভেতর থাকার জন্য কোন বাধ্যতামূলক নির্দেশ জারি হয়নি । শুধু অনুরোধ জানানো হয়েছিল এবং সেটা ছিল মানুষের স্বেচ্ছানির্ভর। জরুরি নয় এমন দোকানপাট ও ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছিল, কিন্তু তা না মানলে কোন আইনি ব্যবস্থা বা শাস্তির বিধান রাখা হয়নি।

তাহলে অন্যান্য অনেক দেশের মত সীমান্ত বন্ধ না করে, কঠোর লকডাউন না দিয়ে, ব্যাপক হারে পরীক্ষা না চালিয়ে আর কড়া কোয়ারেন্টিন না দিয়েও জাপান কীভাবে মৃত্যুর সংখ্যা এত কম রাখতে পারল? জাপানে প্রথম কোভিড ধরা পড়ার ৫ মাস পরেও, জাপানে করোনা শনাক্ত রোগীর সংখ্যা- বিশ হাজারের নিচে, মৃতের সংখ্যা ১ হাজারের কম।

জাপানে ওই জরুরি অবস্থা তুলে নেয়া হয়েছে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা দ্রুত ফিরে এসেছে। জাপানে বেসরকারি সংস্থার কর্মীদের ওপর চালানো টেস্টিং এবং টোকিওতে সরকার এ পর্যন্ত যেসব মানুষকে অপরিকল্পিতভাবে পরীক্ষা করেছে, সেসব পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে খুব কম সংখ্যক মানুষের মধ্যে এই জীবাণু রয়েছে।

দেশটির প্রধানমন্ত্রী শিনেজা আবে গত মাসের শেষের দিকে যখন জরুরি অবস্থা তুলে নেবার কথা ঘোষণা করেন তখন তিনি বেশ গর্বের সঙ্গে এটাকে জাপান মডেল হিসাবে উল্লেখ করেন এবং বলেন অন্য দেশের জাপান থেকে শেখা উচিত।

জাপানের উপ প্রধানমন্ত্রী তারো আসোর কথা যদি আপনি বিশ্বাস করতে চান তাহলে তার মত হল এটা জাপানীদের আদর্শ আচরণের কারণে। তিনি বলেন, জাপানের সাফল্যের কারণ নিয়ে অন্য দেশের নেতারা তাকে প্রশ্ন করেছিলেন। তার উত্তরকে অনেকেই অবশ্য কিছুটা তির্যক মনে করেন- ‘আমি তাদের বলেছিলাম: আপনার এবং আমার দেশের মানুষের আচরণের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তারা শুনে চুপ করে গিয়েছিলেন।’

আসো যে শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন সেটা হল মিন্ডো -তিনি বলেছিলেন তফাৎটা মিন্ডোতে। মিন্ডোর আক্ষরিক অর্থ মানুষের মান যদিও অনেকে বলছেন তিনি সংস্কৃতিগত মানের কথা বলেছেন।

ঐতিহাসিকভাবে জাপানীরা মনে করে জাতি হিসাবে তারা উঁচুতে এবং সাংস্কৃতিক আভিজাত্যের বিষয়টাও তাদের মজ্জাগত। তবে তার এই মন্তব্যের জন্য আসো সমালোচিত হয়েছেন।

তবে তার মন্তব্যের বিষয়টি বাদ দিলেও জাপানের বহু মানুষ এবং অনেক বিজ্ঞানীও মনে করেন জাপানের ক্ষেত্রে একটা কিছু আছে যা আলাদা। একটা কিছু যা কোভিড-১৯ থেকে জাপানের মানুষকে রক্ষা করেছে।

টোকিও ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক তাতসুহিকো কোদামা জাপানের রোগীদের ওপর এই ভাইরাসের প্রভাব নিয়ে কাজ করেছেন। তার ধারণা জাপানে হয়ত আগে কোভিড হয়েছে। কোভিড-১৯ নয়, তবে একইধরনের জীবাণুর অতীত সংক্রমণ জাপানের মানুষকে ঐতিহাসিক ইমিউনিটি দিয়েছে।

তার ব্যাখ্যা এরকম: মানুষের শরীরে যখন কোন ভাইরাস ঢোকে তখন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং তখন শরীর অ্যান্টিবডি তৈরি করে এবং ওই অ্যান্টিবডি ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। অ্যান্টিবডি হয় দুই ধরনের – আইজিএম এবং আইজিজি। আক্রমণকারী ভাইরাস নতুন না পুরনো তার ওপর নির্ভর করে কোনধরনের অ্যান্টিবডি সেক্ষেত্রে কাজ করবে।

তিনি বলছেন, ‘কোন ভাইরাস যদি প্রথমবার আক্রমণ করে তখন প্রথমে সক্রিয় হয়ে ওঠে আইজিএম অ্যান্টিবডি, পরবর্তীতে সক্রিয় হয় আইজিজি। আর কেউ যদি এমন ভাইরাসের শিকার হয়, যে ভাইরাস শরীরে আগেও আক্রমণ করেছিল, তখন সেক্ষেত্রে ইমিউন ব্যবস্থা পরিচিত ভাইরাসের মোকাবেলায় দ্রুত সক্রিয় হয়ে আইজিজি অ্যান্টিবডি ব্যবহার করে।’

অধ্যাপক তাতসুহিকো কোদামা বলছেন, ‘পরীক্ষার ফলাফল দেখে আমরা খুবই অবাক হয়েছি যে সব রোগীর ক্ষেত্রে প্রথমেই দ্রুত সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে আইজিজি অ্যান্টিবডি, এরপর আইজিএম অ্যান্টিবডিও সক্রিয় হয়েছে কিন্তু সেটা পাওয়া গেছে খুবই সামান্য পরিমাণে। এর মানে হল আগে একইধরনের ভাইরাস এদের সবার শরীরে ঢুকেছিল।’

তিনি আরও মনে করছেন ওই এলাকায় যেহেতু আগে সার্স-এর সংক্রমণ হয়েছিল তাই শুধু জাপানেই নয় চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় মৃত্যুর হার অপেক্ষাকৃত কম দেখা গেছে। সূত্র: বিবিসি

What do you think?

Written by Bongo Baarta Desk

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0
আজকের রাশিফল

আজকের রাশিফল : ৫ই জুলাই

মেটিয়াবুরুজ

সংঘর্ষে উত্তাল মেটিয়াবুরুজ, সরানো হল ওসিকে